সত্যের চেয়ে কেন নিরাপত্তাকে বেছে নেয় মস্তিষ্ক?

মানুষ আদিকাল থেকেই নিজেকে সত্যের অন্বেষী বলে দাবি করে আসছে। কিন্তু বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের দর্পণে তাকালে এক ভিন্ন রূঢ় বাস্তবতা ফুটে ওঠে। আমরা আসলে সত্যকে ভালোবাসি না; বরং আমরা এমন একটি আরামদায়ক মিথ্যার খোঁজে থাকি যা আমাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করে। আমাদের মস্তিষ্কের বিবর্তন সত্য উদঘাটনের জন্য হয়নি, বরং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার (Survival) তাগিদে হয়েছে।

প্রাগৈতিহাসিক সাভানা অঞ্চলে যখন হোমো ইরেক্টাস বা নিয়ান্দারথালরা বিচরণ করত, তখন প্রকৃতির নিগূঢ় রহস্য বোঝা তাদের অগ্রাধিকার ছিল না। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিপদ থেকে বাঁচা। বিবর্তন তাদের শিখিয়েছিল—ভয় পেলে পালাতে হবে, অনিশ্চয়তাকে গল্পের ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং একাকীত্বের ভীতি দূর করতে অতিপ্রাকৃতিক সত্তার কল্পনা করতে হবে। আজ আমাদের উন্নত মস্তিষ্কের গভীরেও সেই আদিম তাড়নাগুলো সক্রিয়।

সত্য প্রায়ই নির্মম হয়। এটি আমাদের চিরচেনা নিরাপত্তা কেড়ে নেয়, দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ভেঙে দেয় এবং অনেক সময় আমাদের সামাজিকভাবে একা করে দেয়। আর এই একাকীত্বই মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা আর হাড় ভেঙে যাওয়ার শারীরিক যন্ত্রণা মস্তিষ্কের একই অংশে (ACC) অনুভূত হয়। আদিম মানুষের কাছে সমাজচ্যুত হওয়া মানেই ছিল মৃত্যু। তাই সত্যের চেয়ে সামাজিক সংহতি রক্ষা করা আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষ জন্মগতভাবেই বিজ্ঞানবিরোধী মনোভাব পোষণ করতে পারে, কারণ বিজ্ঞান আমাদের 'স্পেশাল' হওয়ার অহংবোধকে চুরমার করে দেয়। বিজ্ঞান যখন বলে—এই মহাবিশ্ব আপনার জন্য সৃষ্টি হয়নি কিংবা আপনার মৃত্যুতে মহাবিশ্বের কিছুই যায় আসে না—তখন আমাদের মস্তিষ্কের 'অ্যামিগডালা' (Amygdala) একে একটি অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি বা 'Safety Threat' হিসেবে গ্রহণ করে। এই ভয়ের মুখে আমাদের যুক্তিবাদী অংশ 'প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স' অনেক সময় অকেজো হয়ে পড়ে।

ধর্ম কেন আদিমকাল থেকে আজ অবধি অপরাজেয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে। আমাদের মস্তিষ্কে তিনটি স্তর রয়েছে: সরীসৃপ মস্তিষ্ক (Reptilian Brain), লিম্বিক সিস্টেম এবং নিওকর্টেক্স। যুক্তি এবং বিজ্ঞান বাস করে নিওকর্টেক্সে, যা বিবর্তনের ধারায় তুলনামূলক নতুন। অন্যদিকে, আবেগ, ভয় এবং নিরাপত্তার তাড়না নিয়ন্ত্রণ করে লিম্বিক সিস্টেম, যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বছরের পুরনো।


ধর্ম সরাসরি এই লিম্বিক সিস্টেমে আঘাত করে। এটি আমাদের আশ্বাস দেয় যে আমরা একা নই, আমাদের কষ্টের অর্থ আছে এবং মহাবিশ্বের একজন নিয়ন্ত্রক আমাদের দেখছেন। এই ধারণাটি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং ডোপামিন নিঃসরণ করে আমাদের 'সেফ মোডে' নিয়ে যায়। তথ্যের সত্যতা যাচাই করার চেয়ে 'নিরাপদ বোধ করা' আমাদের মস্তিষ্কের কাছে অনেক বেশি জরুরি।

মানুষ একটি সামাজিক জীব হওয়ার কারণে আমাদের মধ্যে 'ইন-গ্রুপ বায়াস' প্রবল। যখন আমরা দেখি আমাদের বিশ্বাসের সাথে অন্য কারো বিশ্বাস মিলে যাচ্ছে, তখন আমাদের 'মিরর নিউরন' সক্রিয় হয় এবং 'অক্সিটোসিন' হরমোন আমাদের মধ্যে একাত্মতা তৈরি করে। বিপরীতভাবে, যখন কেউ আমাদের বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে, তখন মস্তিষ্ক তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। নিজ গোষ্ঠীর স্বার্থে বা বিশ্বাসের লড়াইয়ে কোনো মৃত্যু যখন আমাদের নাড়া দেয়, তখন সেটি মূলত আমাদের আদিম টিকে থাকার লড়াইয়েরই বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক সামাজিক বিপ্লব বা গণ-আন্দোলনগুলোতেও আমরা এই মিরর নিউরন এবং ইন-গ্রুপ বায়াসের প্রবল প্রভাব দেখতে পাই।


১. আবু সাঈদ: মিরর নিউরন এবং 'হিরো' ইমেজ

আবু সাঈদের ঘটনার সময় মানুষের মস্তিষ্কের মিরর নিউরন প্রচণ্ডভাবে সক্রিয় হয়েছিল। যখন সাধারণ মানুষ দেখল একজন তরুণ একা বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছে, তখন তাদের নিজেদের অবদমিত ভয় এবং সাহসিকতা আবু সাঈদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল।

কেন বিপ্লব হলো? মানুষ যখন তাকে দেখল, তখন তারা কেবল একজন ব্যক্তিকে দেখেনি; বরং প্রতিটি ছাত্র বা নাগরিক নিজেকে ওই জায়গায় কল্পনা করেছে। মিরর নিউরনের কারণে তার সাহস কোটি মানুষের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং 'ইন-গ্রুপ বায়াস' (আমরা সবাই একই শোষণের শিকার) সবাইকে এক করে ফেলে।

২. হাদি: ইন-গ্রুপ কানেকশন

হাদির মৃত্যুতেও আমরা একই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব দেখি। এখানেও ইন-গ্রুপ বায়াস কাজ করেছে। যখন নির্দিষ্ট একটি আদর্শিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাউকে আক্রমণ করা হয়, তখন ওই একই বিশ্বাসের কোটি কোটি মানুষ তাকে নিজেদের পরিবারের সদস্য মনে করে। তাদের মস্তিষ্কের মিরর নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তারা হাদির ব্যথার সাথে একাত্মতা অনুভব করে। এটি মানুষকে দ্রুত রাজপথে নামাতে বা বড় আন্দোলন তৈরি করতে বাধ্য করে।

৩. দিপু চন্দ্র দাস: মিরর নিউরনের নীরবতা (Dehumanization)

দিপু চন্দ্র দাসের ঘটনাটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। যখন কোনো ব্যক্তি আমাদের 'ইন-গ্রুপ'-এর (আমাদের ধর্ম, আমাদের দল বা আমাদের আদর্শ) বাইরের কেউ হয়, তখন মস্তিষ্ক তাকে 'আদার' (Other) বা পর হিসেবে চিহ্নিত করে।

কেন মানুষ চুপ ছিল? বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে 'মস্তিষ্কের মিরর নিউরন সাইলেন্ট থাকা'। যখন সমাজ কাউকে শত্রু বা ভিন্ন গোষ্ঠীর মনে করে, তখন তার প্রতি সহমর্মিতা কাজ করে না। মস্তিষ্ক তাকে একজন মানুষ হিসেবে না দেখে একটি 'অবজেক্ট' বা বস্তু হিসেবে কল্পনা করে। ফলে তার ওপর হওয়া নৃশংসতা বাকি কোটি মানুষের নার্ভাস সিস্টেমকে নাড়া দেয় না। তারা একে 'আমাদের সমস্যা নয়' বলে এড়িয়ে যায়।

পরিশেষে বলা যায়, আমাদের খুলির ভেতরে দুটি ভিন্ন সত্তার নিরন্তর যুদ্ধ চলছে। একটি সত্তা চায় যুক্তি ও সত্যকে আলিঙ্গন করতে, অন্যটি চায় আবেগ ও বিশ্বাসের আশ্রয়ে নিরাপদ থাকতে। ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃতিক বিশ্বাস কোনো আকস্মিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের এক অনিবার্য বিবর্তনীয় ফল। যতক্ষণ পর্যন্ত একাকীত্ব মানে মৃত্যু এবং নিরাপত্তা মানেই জীবন—ততক্ষণ মানুষ সত্যের চেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক মিথ্যার প্রতিই বেশি আসক্ত থাকবে।

 

Comments

Popular posts from this blog

শেখ হাসিনার পতন এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর ভূমিকা

অক্লান্ত পরিশ্রম: বাস ড্রাইভারদের অদেখা ত্যাগ