অক্লান্ত পরিশ্রম: বাস ড্রাইভারদের অদেখা ত্যাগ

মাঝেমধ্যেই বেশ লম্বা বাস জার্নি করতে হয় আমাকে। কখনো কখনো সেই জার্নি একটানা ৫-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গড়ায়। শুভাকাঙ্খীরা যখন এই অভিজ্ঞতা শুনে ব্যথিত হন, তখন তারা আমার জন্য সমবেদনা জানায়। কিন্তু আমি প্রায়শ ভাবি সেই ড্রাইভারদের কথা, যারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ অথবা দিনাজপুর থেকে রওয়ানা দিয়ে নিয়মিত সিলেট, চট্টগ্রাম, কিংবা লক্ষীপুর যাতায়াত করে। তাঁদের কথা ভাবলে মনে হয়, তাঁদের কাজটা কতটা কঠিন, এবং সেই কঠিন পরিশ্রমের ফলে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাই।এই মানুষগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই প্রতি রাতে হাজারো মানুষ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। তাদের ত্যাগের কারণেই আমি প্রতিদিন ক্লাস করার মতো সুযোগ পাই, যেখানে এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে আমাদের থাকার ও কাজ করার জায়গা হয়। অথচ, তাঁদের শ্রমের মূল্য অনেক সময় আমাদের অজান্তেই অগোচরে চলে যায়।


যখন আমরা রাস্তার জ্যামে আটকা পড়ি (ঈদের সময় বাদে), তখন আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। তবে আমাদের খারাপ লাগা কিছুকাল পরেই কেটে যায়, কারণ আমরা জানি যে, কিছু সময় পরেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছাব। কিন্তু বাস ড্রাইভারের জন্য বিষয়টা একেবারেই আলাদা। রাস্তায় তাদের একে একে ষোলো-আঠারো ঘণ্টা পর্যন্ত ড্রাইভিং সিটে বসে থাকতে হয়। মাঝে মাঝে আমাদের চোখে ঘুম ভর করে, কিন্তু তাদের জন্য সে সুযোগ থাকে না। এমনকি, সারারাত চিৎকার করে ড্রাইভারকে সাহায্য করা ছেলেটিও (হেলপার) মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু ড্রাইভারের মনের মধ্যে থাকে একমাত্র চিন্তা— এক সেকেন্ডের জন্যও যদি তাদের অমনোযোগিতা হয়, তবে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। সেই ভাবনা তাদের পুরো পথজুড়ে নির্ঘুম রাখে।

এই প্রেক্ষাপটে, ইউরোপে গাড়ি চালানোর নিয়মগুলোর তুলনা করা গেলে দেখা যায়, তারা একটানা বাইশ-চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যেমন ডেনমার্ক, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া বা ক্রোয়েশিয়া, যেখানে আইন অনুযায়ী একটানা ছয় ঘণ্টার বেশি ড্রাইভ করা নিষিদ্ধ, সেখানে গাড়ির কেবিনে একজন ড্রাইভার সবসময় বিশ্রামে থাকে। গাড়ির চালকরা নিয়মিত বিশ্রাম নেন, এবং ড্রাইভিংয়ের মাঝে কোনও চাপ বা অতিরিক্ত ক্লান্তি সঞ্চয় হওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে আমাদের দেশে, বিশেষত দূরপাল্লার বাসগুলোতে এই লোকগুলোর অমানুষিক পরিশ্রমের ফলেই পুরো সিস্টেমটা কার্যকর থাকছে। তাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নীরব ত্যাগের জন্য আমাদের জীবন অনেকটা সহজ হয়ে থাকে।

তাদের কাজের মূল্যায়ন করা বা শ্রদ্ধা জানানো উচিত, বিশেষত আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে যেভাবে তারা নিরাপদ করে তোলেন। যতটা সম্ভব আমরা এই পরিশ্রমী মানুষদের কষ্ট এবং তাদের প্রয়োজনীয় বিশ্রামের কথা মনে রাখলেই, আমাদের মনস্তত্ত্ব ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে পারি।

Comments

Popular posts from this blog

সত্যের চেয়ে কেন নিরাপত্তাকে বেছে নেয় মস্তিষ্ক?

শেখ হাসিনার পতন এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর ভূমিকা